#মু.বিল্লাল হোসেন
আওয়ামীলীগ এবং ছাত্রলীগের প্রতি মানুষের বিশ্বাস স্বমূলে উঠে গিয়েছিলো, যার প্রমান ১৯৭২ সালের "ডাকসু " নির্বাচনে ছাত্রইউনিয়ন প্যানেলের ভিপি নির্বাচিত হওয়া। ১৯৭৩ সালের ১লা জানুয়ারী ভিয়েতনাম যুদ্ধ উপলক্ষে, ছাত্রদের প্রতিবাদি মিছিলে পুলিশের গুলিতে দুইজন ছাত্র নিহত হয় এবং অনেকে আহত হয়। পরদিন সাড়া দেশে হরতাল পালিত হয়। ফলে দৃষ্টতই ছাত্রদের মধ্যে আওয়ামিলীগের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। দেশের বর্ডার প্যাক্ট ও পাট নীতি উপলক্ষে জনগণের মাঝেও আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়তার ভাটা শুরু হয়।
১৯৭৫ সালের ১৯ জানুয়ারী সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে শাসন ব্যাবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রী পরিষদকে সংসদের নিকট জবাবদিহির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির নিকট জবাব দিহির বিধান তৈরী করা হয়। মন্ত্রীদের সংসদ সদস্যদের বাহির থেকে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়। ইতঃপূর্বে সংসদ চাইলে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করাতে পারতো, কিন্তু নতুন সংশোধনীতে সে বিধান কে বৃদ্ধা আঙ্গুলী দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি চাইলে যে কোন সাংসদের পদ বিলুপ্ত করতে পারবে বিধান করা হয়৷
দেশে বহুদলীয় ব্যাবস্থাকে বিলুপ্ত করে বাকশাল কায়েম করা হয়। সব কিছুতে রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীক জ্বী হুজুর ব্যাবস্থা কায়েম করা হয়। রাষ্ট্রপতি সব কিছুর হর্তা কর্তা হয়ে যান। ৭৩ সালের নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মেয়াদ ৭৫ সাল থেকে ৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়। আওয়ামীলীগের ক্ষমতাকে কণ্টকাকীর্ণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আরো নানাবিধ আইন তৈরী করা হয়।
শেখ মুজিবের রক্ষী বাহিনীর প্রতি ভরসা বৃদ্ধি পাওয়া ছিলো, তার জন্য কাল স্বরুপ। এতে করে সেনাবাহিনীর ভিতর নানা গঞ্জনা শুরু হয়। কারণ সেনাবাহিনীর পরিবর্তে রক্ষিবাহিনীর কদর বেড়ে গিয়েছিলো। কিছু আওয়ামীলীগের নেতাদের কাছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অফিসারদের সম্মানহানীর ঘটনা ঘটেছিলো। এছাড়াও
বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন কাজে সেনাবাহিনীর মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যার সর্বশেষ পরিণতি ছিলো বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সপরিবার হত্যা ছিলো, বাঙালির ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এটা কখনও মেনে নেয়ার মতো কাজ ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর রজনৈতিক ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো বা থাকতে পারে।
কিন্তু তার ক্ষেসারত কি সমস্ত পরিবারকে দিতে হবে?ধরে নিলাম শেখ কামাল অপরাধ করেছিলো রাজনীতি করার কারণে।
কিন্তু কি দোষ ছিলো ছোট শিশু রাসেলের? কি দোষ ছিলো বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার? কি দোষ ছিলো পরিবারের অন্য সদস্যদের? এই হত্যাকান্ড ছিলো সম্পূর্ন ষড়যন্ত্রের, তা বাঙালি জাতির বুঝতে সময় লাগেনি। কারন তারা শুধু বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে হত্যা করে থেমে থাকেনি, তার ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনেবিয়াতকে হত্য করেছিলো তার বাস ভবনে গিয়ে। শাসন কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে হয়তোবা বঙ্গবন্ধুর ভুল স্ট্রেটেজি ছিলো, তার জন্য তাকে হত্যা করতে হবে? তাও সপরিবারে। বঙ্গবন্ধু কি সত্যই হত্যাযোগ্য অপরাধ করেছিলেন? না।
১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের নায়ক এবং সেনা অভ্যূথানের অগ্রদূত ছিলেন কর্ণেল ফারুক, মেজর ডালিম ও মেজর রশিদ। এদের মাথার ছায়া হিসেবে কাজ করেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ । বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় ঐদিন ঘাতকরা যে ট্যাংক ব্যাবহার করেছিল তা নাকি ছিলো অকার্যকর। রক্ষাবাহিনির সদর দপ্তরে কিছু ট্যাংক তাক করে রাখাতেই, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভরসার বাহিনী ভয়ে নিশ্চুপ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ করার পূর্বে তিনি তৎকালীন সেনা প্রধান কে এম শফিউল্লাহ কে ফোন করেছিলেন। কিন্তু খবর শুনে সেনা প্রধান সাহেবও ভারিক্কিতে পরে গিয়েছিলেন। তিনিও কিংককর্তব্য বিমূর হয়ে যান। দুই ঘন্টা সময় পেয়েও তিনি বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের জন্য কিছু করতে পারেন নি। কিন্তু কেন? কেন তিনি কিছু করতে পারলেন না তা আজও অজানা।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে বাংলাদেশ বেতারে ঘন ঘন বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছিলো। উল্লাসিত কন্ঠে একজন বলছেঃ "আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী মুজিব সরকারকে সেনা অভ্যূথানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছে। সারা দেশে মার্শাল ল' জারি করা হলো।" খন্দকার মোশতাক আহমেদ কে রাষ্ট্রপতি করা হয়। এবং তিনি গুটিকয়েক আওয়ামী নেতাদের নিয়ে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার মাধ্যমে দেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়। সামরিক শাসন চলতে থাকে, এভাবে খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশ ২মাস ২০দিন পরিচালনা করেন। ১৫ই আগস্টের সেনা অভ্যূথানের ৩মাস পর আবার সেনা অভ্যুথান ঘটান খালেদ মোশাররফ। তিনি ছিলেন সেনাবিহিনীর চিফ অফ স্টাফ জেনারেল । তিনি সেনা অভ্যুথানের পর দোটানায় ছিলেন, কি হবেন সেনাপ্রধান না রাষ্ট্রপতি? এ নিয়ে চলে অনেক বনিবনা। সর্বশেষ তিনি সেনা প্রধান হয়েছিলেন, এই শর্তে যে রশিদ,ডালিম এবং ফারুকদের বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। তারা বিদেশ যাওয়ার পূর্বে আরেকটি হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে যান, আর তা হলো আওয়ামীলীগের চার নেতাকে জেলের মধ্যে হত্যা করা। চার নেতা হলেনঃ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টে মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান।
বৃটিশ থেকে বাংলাদেশ প্রত্যশা ও প্রাপ্তি (পর্ব-৫)
Reviewed by pencil71
on
July 17, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
July 17, 2021
Rating:

No comments: