আজ ২৩ শেষ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। এই দিনে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে বৃটিশদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এই যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রায় ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিলো। যা ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের হতে একবার এবং ১৯৭১ সালে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার সূর্য পুনরায় জাগ্রত হয়েছিলো। নবাব যুদ্ধের পর ধৃত হন, এবং মীর জাফরের ছেলে মীর মীরনের নেতৃত্বে মোহাম্মদী বেগ নবাবকে হত্যা করেন। নবাবের, স্ত্রী এবং সন্তানকে মুর্শিদাবাদে আনয়ন করা হয় এবং তাদের জন্য মাসিক নিদির্ষ্ট পরিমাণ বৃত্তি ধার্য্য করা হয়।
নবাব সিরারজউদ্দৌলার যুদ্ধে পতনের অনেক কারণ ছিলো। তার মধ্য অন্যতম ছিলো মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতা। এছাড়াও ছিলো খালা ঘষেটি বেগম, খালাতো ভাই শওকত জং, জগৎ শেঠ, রায় দূর্লভসহ আরো কিছু বড় বড় ব্যাবসায়ীদের ষড়যন্ত্র।
মীর মদন মরনপন যুদ্ধ করেও ষড়যন্ত্রের জন্য নবাবকে
যুদ্ধে হারতে হয়েছিলো।
নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের অন্যতম একটি কারণ ছিলো জনগনের সাথে নবাবের ভালো সম্পর্ক না থাকা।
তৎকালিন নবাবরা জনগনের উন্নয়েন তেমন ভূমিকা পালন করেনি। তাই জনগন নবাবের পতন নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। কারণ শাসক যেই হোক তাদের করের ঘানি টানতে হবে, এবং নিজেদের বাঁচা নিজেদের বাঁচতে হবে। জনগনও এটা ভাবেনি, যে নবাবের পতনে তাদের দুইশত বছর গোলামি করতে হবে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে নীলচাষ করতে হবে এবং ইংরেজদের একচেটিয়া বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তাহলে হয়তো তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতো।
নবাবের পতনের অনেক কারণের মধ্যে আরেকটি ছিলো ইংরেজদের আধুনিক সমরাস্ত্র। লর্ড ক্লাইভ একজন বাণিজ্য প্রতিনিধি হয়ে যে ধরনের অস্ত্রের মালিক ছিলো, বাংলার নবাবের কাছে সে পরিমাণ অস্ত্র ছিলো না। তাছাড়া নবাব অল্প বয়স্ক হওয়ার কারণে তার রাজনৈতিক দূর দর্শিতা কম ছিলো। সে তুলনায় বৃটিশরা বেশি কুটকৌশলী ছিলো।
ষড়যন্ত্রের ফল যে ভালো হয় না, এটা টের পেতে মীর জাফরের বেশি সময় লাগেনি। তিনি নামে মাত্র শাসক ছিলেন এবং সকল হর্তাকর্তা ছিলেন ইংরেজরা। লর্ড ক্লাইভ বাংলার শাসন ভার সরাসরি গ্রহন করে নাই, যাতে করে জনগন বিদ্রোহী হয়ে না ওঠে। মীর জাফরের পরে মসনদে বসে মীর কাশিম। মীর কাশিম ছিলেন অনেকটা স্বাধীনচেতা, তাই বৃটিশদের সাথে তার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজয় বরণ করলে, স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন সম্পূর্ণ বেহেশতে যায়। ষড়যন্ত্রকারী নবাবের খালা ঘষেটি বেগম কেও দিতে হয়েছে চরম মূল্য। আর তা ছিলো বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘষেটি বেগম সমেত নবাবের মা আমেনা বেগম কেও নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা।
বাংলার ধন সম্পদ লুটে নিয়ে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়েছিলো আঙ্গুল ফুলে কলা গাছের মতো।
এবং বাংলায় শুরু হয় অভাব অনটন এবং দূর্ভিক্ষ। ১৭৭০ সাল অনুযায়ী বাংলা ১১৭৬ সনে বাংলায় দূর্ভিক্ষ হয়। যা ছিয়াত্তরের মতান্তর। এই দূর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়। দেশীয় শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, বহু ভূস্বামী করের বোঝা বহন করতে না পেরে ভূমিহীন হয়ে যায়। এভাবে শোষন, নির্যাতনের মাধ্যমে চলতে থাকে বাংলায় বৃটিশ শাসন।
পর্যায়ক্রমে বৃটিশরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য দখল করে নেয়। ১৭৯০ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে অসংখ্য জমিদার তাদের জমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো। এরপর পর্যায়ক্রমে বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। যেমন ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আন্দোলন। ১৭৬০- ১৮০০ সাল পর্যন্ত মুসলিম ফকির সন্ন্যাসির এবং হিন্দু তাপসরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলো। তাদের আন্দোলন সারা দেশ ব্যাপি বিস্তৃত ছিলোনা এবং তেমন সুসংগঠিত ছিলোনা, যার ফলে আন্দোলন সফলতা ছাড়াই স্তিমিত হয়ে যায়।
আঠারো শতকে শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপে নীলের ব্যাপক চাহিদা বাড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশ নীল চাষের উপযোগি হওয়ার বৃটিশ বেনিয়ারা কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করেছিলো। ঊনিশ শতকের শুরুতে শুরু হয় নীল বিদ্রোহ, চলতে থাকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত। কৃষকদের আন্দোলনের ফলে বৃটিশ সরকার ১৯৬০ সালে প্রথমে নীল কর্ম কমিশন গঠন করে এবং ১৯৬২ সালে নীল আইন তৈরির ফলে নীল বিদ্রোহ থেমে যায়।
বিভিন্ন কারনে মুসলিমরা তাদের ধর্ম থেকে দূর সরে গিয়েছিলো। বিভিন্ন কুসংস্কার মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করে। তারা শিরক, বিদায়াত সহ নানা কুসংস্কারে জড়িয়ে গিয়েছিলো। এই অবস্থা থেকে মুসলমানদের জেগে ওঠার জন্য, ফরয পালনে গুরুত্ব দেয়ার জন্য হাজ্বী শরীয়াতুল্লাহ শুরু করেছিলেন আন্দোলন। সে আন্দোলনকে বলা হয় ফরায়েজি আন্দোলন। শরীয়াতুল্লাহর মৃত্যুর পর তার ছেলে দুদ মিয়া আন্দোলন পরিচালনার সময় জমিদারদের থেকে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ফলে তিনি আন্দোলন কে চাংগা করার জন্য গড়ে তুলেছিলেন লাঠিয়াল বাহিনী। এরপর দুদু মিয়ার মৃত্যুর পরে আন্দোলন স্থবির হয়ে যায়।
মুসলিমদের নব চেতনায় জাগ্রত হওয়ার জন্য আহ্বান করেছিলেন আর একজন অগ্রদূত। তিনি হলেন মীর নিসার আলী তিতুমীর। তিনিও জমিদারদের কাছ হতে বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এজন্য তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে জমিদারদের প্রতিরোধ করেন। তিনি চব্বিশ পরগানা, নদীয়া এবং ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে স্বাধীন ভূমি ঘোষনা করেন। বৃটিশ সরকার তিতুমীরকে প্রতিরোধ করতে এসে প্রথমে নাজেহাল হন। পরবর্তীতে কর্ণেল হার্ডিংয়ের নেতৃত্বে ১৮৩১ সালে ১৪ই নভেম্বরে আধুনিক সমরাস্ত্র সহ তার বাঁশের কেল্লা হামলা করলেন এবং তিনি চল্লিশ জন সহযোগীসহ শহীদ হন।
উত্তর ভারতে মুসলিম নেতা শহীদ আহমেদ ব্রেলভী বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিশাল এলাকা নিয়ে দাওলাতু ইসলাম তথা ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করেন৷ কিন্তু স্থানীয় মুসলিমদের গাদ্দারী, মারাঠা এবং বৃটিশদের যৌথ হামলায় ১৮৩১সালে ৬ই মে তার অসংখ্য অনুসারীসহ শহীদ হন।
বৃটিশরা শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলো মুসলিমদের কাছ হতে। ফলতঃ তারা মুসলিমদের কাছ থেকে ব্যাপক বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। যার ফলে বৃটিশরা হিন্দুদের কাছে টেনে নিয়েছিলো। কিন্তু যখন শাসন স্থায়ী হলো তখন আগের মত হিন্দুদের সম্মান করেনি।
বৃটিশদের নতুন অস্ত্র খোলার জন্য মুখ ব্যাবহার করতে হয়েছিলো, যেখানে শুকরের চর্বী ব্যাবহৃত হয়েছিলো। আরেক ধরনের অস্ত্রে গরুর চার্মা ব্যাবহার করেছিলো। ফলতঃ ধর্মীয় কারণে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় জাতি বৃটিশদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৮৫৭ সালে ১০ ই মে ব্যারাকপুরের মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে প্রথম সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়। যা সারা ভারত ছড়িয়ে পরে।
কিন্তু বিদ্রোহের একক নেতৃত্বহীনতার ফলে সিপাহি বিদ্রোহ ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের জন্য দিল্লির সম্রাট বাহদুর শাহ জাফরকে দায়ি করা হয় এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের অবসান হয় এবং সরাসরি বৃটিশ সরকার শাসন শুরু করে।
এই বিদ্রোহের পরে অসংখ্য সিপাহিকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছিলো। এবং এসব শহিদ দের স্মরণে ঢাকায় ভিক্টোরিয়া পার্কেের নামকরন করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। তিনি ছিলেন সর্বশেষ মুগল সম্রাট।
এরপর ১৮৬১ সালে ভারত শাসন আইন গঠন করা হয়েছিলো, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস গঠন করা হয়েছিলো, ১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ করা হয়েছিলো, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন করা হয়েছিলো, ১৯১১ সালে বঙ্গ ভঙ্গ রধ করা হয়েছিলো, ১৯২৮ সালে দ্বিজাতি তত্ত্ব ঘোষনা করা হয়েছিলো, ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন গঠন করা হয়েছিলো, ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলো, ১৯৪৬ সালে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো এবং সর্বশেষ ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করার মাধ্যমে বৃটিশদের শাসনের অবসান হয়েছিলো।
বিঃদ্রঃ শেষের ঘটনাগুলোর বর্ণনা আমার আরেকটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, তাই এই প্রবন্ধ বিস্তারিত লিখলাম না।
লেখক
মো. বিল্লাল হোসেন
অনার্স চতুর্থ বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ।
মাদারীপুর সরকারি কলেজ, মাদারীপুর।
স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রায় ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিলো// মু.বিল্লাল হোসেন
Reviewed by pencil71
on
June 23, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
June 23, 2021
Rating:

No comments: