পলাশী, নব্য মীর জাফর ও গোলাম রাষ্ট্র আজাদ করবার দায়
আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে বাংলা তার স্বাধীনতা হারায় এবং ১৯০ বছরের জন্য কলোনী শাসনের অধীনে চলে যায়। এই ১৯০ বছর বাংলার মানুষ দুইটা লেয়ারের নিচে চাপা পড়ে ছিল, উপরের লেয়ারে ছিল বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী আর দ্বিতীয় লেয়ারে ছিল বর্ন হিন্দু জমিদাররা। বৃটিশ শাসনাধীনে যাওয়ার মাত্র ১৩ বছরের মাথায় ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে শুরু হওয়া এক দুর্ভিক্ষে বাংলার ১ কোটি লোক মারা যায় তখন বাংলার মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি। অর্থ্যাৎ বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ একটা দুর্ভিক্ষেই শেষ হয়ে যায়। যেই বাংলা ছিল দুনিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা, বৃটেনে সম্পদ পাচারের ফলে সেই বাংলা হয়ে যায় দুনিয়ার দরিদ্রতম এলাকা।
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা বৃটিশদের দ্বারা ১৯০ বছর যাবত শাসিত-শোষিত হলেও বর্তমান ভারতের অধিকাংশ এলাকা এবং পাকিস্তান ১৮৫৭ সাল থেকে বৃটিশ কলোনীর অধীনে যায়। ফলে কলোনী শাসনে ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৃহত্তর বাংলা।
সেই সময় বাংলা ছিল দুনিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা, সোনা-রুপা ছাড়া বাংলাকে কিছু আমদানি করতে হতো না বরং বাংলা থেকে মসলা, রেশম এবং মসলিন সহ অনেক কিছু রপ্তানি হতো। বাংলার এই সমৃদ্ধির ফলে ইংরেজসহ অনেক ইউরোপীয়রা বাংলাতে ব্যবসার জন্য আসতো। ইংরেজ কোম্পানীকে একবার করমুক্ত ব্যবসার সুযোগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল কোম্পানীর কর্মচারীরা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা শুরু করল এবং কোম্পানীকে দেয়া ট্যক্স ফ্রী সুবিধার অপব্যবহার করতে থাকল। বাংলার শাসকরা এটা পছন্দ করত না এবং এই ব্যাপারে ইংরেজদেরকে বার বার সতর্ক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নবাব সিরাজ উদ দৌলা ক্ষমতায় আসার পর ইংরেজদের ব্যক্তিগত ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহন করেন আর এখান থেকেই নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য শুরু হয়ে যায় ইংরেজদের নানা প্রচেষ্টা।
নবাবের দরবারে কর্মরতদের মধ্য থেকে একটা নবাব বিরোধী জোট তৈরির লক্ষ্যে যেই মানুষটা কাজ শুরু করেন তিনি ছিলেন উইলিয়াম ওয়াটস; উইলিয়াম ওয়াটসকে সহযোগিতা করেন লিউক স্ক্র্যাফটন আর পুরা বিষয়টা দুর থেকে তদারকি করেন রবার্ট ক্লাইভ। এই চক্রটি তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যেই দুইজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় তারা ছিলেন মীর জাফর এবং জগৎশেঠ। পুরা চক্রটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা ১৯০ বছরের জন্য পরাধীনতার শৃংখলে চলে যায়! ইংরেজদের পরিকল্পনা ছিল মীরজাফর এবং জগৎশেঠ যদি এই পরিকল্পনায় সহযোগিতা না করে কিংবা কোন কারনে পরিকল্পনাটা ব্যর্থ হয়ে যায় তাহলে তারা মহারাষ্ট্রের মারাঠি জাতির সহযোগিতা নিবে, তবে প্রথম পরিকল্পনাটা সফল হয়ে যাওয়ার ফলে ইংরেজদেরকে আর কষ্ট করে মুম্বাই যেতে হয়নি!
ইতিহাসের আলোচনা মানে কতগুলা দিন-তারিখ মুখস্থ করা নয় বরং সেখান থেকে কি কি শিক্ষনীয় সেটাকে গ্রহন করা আর বর্তমানে এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করতে পারা। উইলিয়াম ওয়াটসের মত বিদেশী কুচক্রী, জগৎশেঠের মত স্থানীয় লোভী ব্যবসায়ী আর মীর জাফরের মত যে কোন শর্তে ক্ষমতা প্রাপ্তি-ভোগ করার লোকজন বর্তমান সময়েও আছে, এইসব মানুষকে চিনতে পারাই হচ্ছে পলাশী দিবসের স্বার্থকতা।
পলাশী, নব্য মীর জাফর ও গোলাম রাষ্ট্র আজাদ করবার দায়
Reviewed by pencil71
on
June 23, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
June 23, 2021
Rating:

No comments: