এক মজলুমের কথকতা
রবিন খান
ইসলামের ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা অনেক মজলুমের সাক্ষাৎ পাই। যারা শত প্রতিকূলতা ও দুনিয়াবী বাঁধা বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও নিশ্চুপ থাকেননি, সত্যের পক্ষ্যে মাথা উঁচু রাখার চেষ্টা করেছেন মৃ্ত্যুর আগ পর্যন্ত। হয়তো এর ফলে কাউকে কাউকে শাসকের তলোয়ারের নিচে মাথা পেতে দিতে হয়েছে।
এমনি একজন মজলুম ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবি হুজার ইবনে আদি রা.। তিনি ছিলেন সৎ, ইবাদত গুজার, মায়ের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি, রাসূলুল্লাহ সা. এবং রাসূল বংশধরদের প্রেমিক। যার সম্পর্কে বলতে যেয়েই হয়তো রাসূলুল্লাহ সা. ভবিষৎ বানী করেছিলেন, ’আযরা অঞ্চলে কিছু লোককে হত্যা করা হবে। তাদের হত্যাকান্ডে মহান আল্লাহ্ নারাজ হবেন এবং আকাশের অধিবাসী সকলেই নারাজ হবে।’
হযরত আলী রা. ও বলেছিলেন, ‘ হে ইরাকী জনগণ! তোমাদের সাতজন লোক আযরা অঞ্চলে নিহত হবে। ওদের অবস্থা হবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ আসহাব-ই-উখদূদ তথা অগ্নিকূন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী লোকদের মতো।’
সময়টা ছিল ৫১ হিজরীর পরবর্তী । অনাকাংখিত ফিতনার কারনে হযরত উসমান রা. এর শাহাদাত, হযরত আলী রা. এর শাহাদাত এবং হযরত হাসান রা. কর্তৃক খেলাফতের দায়িত্ব তৎকালীন সিরিয়ার আমীর মুয়াবিয়া রা. এর উপর সমর্পণ করার পর থেকেই ইসলামের মূল আদর্শ ও প্রাণসত্ত্বা যেনো হারিয়ে যেতে থাকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে।
এ সময়ে বিভিন্ন প্রদেশেই জুম্মার খুতবাতে রাসূলুল্লাহ সা. এর বংশধরদের প্রতি অসৌজন্যমূলক বক্তব্য রাখা হতো, উপস্থিত লোকজন তখন ভয় ও অনিচ্ছা সহকারে তাদের বক্তব্য শুনে যেতো। এরই মাঝে কেউ কেউ এমন সাহসী ছিল যারা শাসকদের এই অন্যায় আচরনের প্রতিবাদ করতো। হুজার রা. ছিলো তাদের মধ্যে একজন আর এই কারনে শাসক শ্রেনীও তার প্রতি ক্রুদ্ধ ছিলো।
একবার ইরাকের গর্ভনর যিয়াদ ইবনে সুমাইয়া জুম্মার সালাতে খুতবা এতটাই দীর্ঘ করেছিলো যে সালাতের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশংকা ছিলো। তখন হুজার রা. চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আস সালাত’ অর্থাৎ সালাত আদায় করুন এর পরও যিয়াদ খুতবা চালিয়ে যাচ্ছিলেন দেখে হুজার রা. যিয়াদের প্রতি কংকর ছুঁড়ে মারেন এবং বলতে থাকেন সালাত আদায় করুন।
এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে যিয়াদ ইবনে সুমাইয়া তখনকার ইসলামি সাম্রাজ্যর আমীরকে চিঠিতে করনীয় জানতে চাইলে তাকে লোহার শিকলে বেধেঁ তার কাছে নিয়ে যেতে বলা হয়। যখন তাকে বন্দী করে আমীরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে হুজার রা. এবং তাঁর সাথীদের হত্যা করার আদেশ দেন। তার আদেশ মতো প্রহরীরা “সানিয়্যা আল-ইকাব” গিরী পথের মোড়ে “আযরা” স্থানে তার সাথীদের সহ হত্যা করে যেরুপ রাসূলুল্লাহ সা. ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন।
হুজার ইবনে আদী রা. কে হত্যার খবর যখন উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রা. কে জানানো হয় তখন তিনি তৎকালীন আমীরের কাছে পত্রবাহকের মাধ্যমে জানতে চান, আপনি কি হুজার ইবনে আদ রা. কে হত্যা করেছেন?
উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর সাথী এক লক্ষ লোককে হত্যা করার চাইতে শুধু তাঁকে হত্যা করা আমার নিকট ভালো মনে হয়েছে।
এরপর একদা তৎকালীন আমীর, আয়েশা রা. এর নিকট আসলে আয়েশা রা. তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, হুজার রা. ও তার সাথীদের হত্যা করতে কিসে আপনাকে প্ররোচিত করেছিলো?
উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘হে উম্মুল মু’মিনীন! ওদেরকে হত্যা করার মধ্যে আমি সাধারণ জনগণের কল্যাণ দেখতে পেয়েছিলাম। আর ওদেরকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে জনসাধারণের অশান্তি দেখতে পেয়েছিলাম।’ তখন আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি- ‘আযরা অঞ্চলে কিছু লোককে হত্যা করা হবে। তাদের হত্যাকান্ডে মহান আল্লাহ্ নারাজ হবেন এবং আকাশের অধিবাসী সকলেই নারাজ হবে।’
হযরত হুজার রা. কে হত্যা করার মূহুর্ত!
যখন তাঁকে হত্যা করার প্রস্তুতি নেওয়া হয় তখন তিনি হত্যাকারীদের বললেন, আমাকে একটু সুযোগ দাও আমি ওযূ করে নিই। তারা রাজি হলে তিনি বললেন, আমাকে দু’রাকায়াত সালাত আদায়ের সুযোগ দাও এতেও তারা রাজি হলো। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে দু’রাকায়াত সালাত আদায় করে বললেন, আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি এমন না, বলার আশংকা না থাকলে আমি সালাত দু’রাকায়াত আরো দীর্ঘ করে আদায় করতাম।
তাকে খননকৃত কবরের নিকট নিয়ে জল্লাদ তরবারী হাতে প্রস্তুত হলে হঠাৎ তার ঘাড়ের রগ কেঁপে উঠে এতে জল্লাদ বলে, আপনি বলেছেন ‘ আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত নই’ অথচ আপনি ভীত! তখন হুজার রা. বললেন, ‘আমি ভীত হব না কেন? ’ আমি আমার জন্য খননকৃত কবর স্বচক্ষে দেখছি, বিছানো কাফন দেখছি এবং খাপ খোলা তলোয়ার দেখছি!
মৃত্যু পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন, তাকে যেনো শিকলবদ্ধ অবস্থায়ই দাফন করা হয়, তারপর তাই করা হয়। তার শহীদ হওয়ার খবর হযরত হুসাইন রা. এর নিকট পৌছলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘ওরা কি তাঁকে বন্দী অবস্থায় দাফন করেছে? তাঁর জানাযা আদায় করেছে? ’ যখন তাকে জানানো হয় হ্যাঁ তা-ই করা হয়েছে তখন তিঁনি বললেন, ‘ আল্লাহর কসম! হুজার রা. ওদের (হত্যাকারী) উপর জয়ী হয়েছেন।’
আল্লাহতায়ালা হয়তো এভাবেও তার ঈমানদার সাহসী বান্দাদের সম্মানীত শহীদের মর্যাদা দান করেন। আর বর্তমানের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেন যাতে তাঁর বান্দার হক্ব এবং বে হক্ব এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, নিজেদের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং পরকালের জবাবদিহীর ব্যাপারে ভয়ে থাকে। পরকালের জবাবদিহীর ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সা. থেকে একটি হাদিস রয়েছে যা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকে ভীত করার জন্য যথেষ্ঠ। কি সেই কথা?
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. একবার তার সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, বলতো প্রকৃত গরীব কে? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমরা তো মনে করি, আমাদের মধ্যে যার টাকা-পয়সা, ধনদৌলত নেই, সে-ই গরীব। রাসূলুল্লাহ সা. বললেনঃ কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি গরীব হবে, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে সালাত, সিয়াম ও যাকাত আদায় করে আসবে; কিন্তু সাথে সাথে সেসব লোকেদেরকেও নিয়ে আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো অপবাদ রটিয়েছে, কারো সম্পদ খেয়েছে, কাউকে হত্যা করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে; এমন ব্যক্তিদেরকে তার নেকীগুলো দিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর যখন তার পুণ্য শেষ হয়ে যাবে অথচ পাওনাদারদের পাওনা তখনো বাকি, তখন পাওনাদারদের গুনাহ তথা পাপ তার ওপর ঢেলে দেয়া হবে, আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম)।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমিন।
এক মজলুমের কথকতা || মু.রবিন খান
Reviewed by pencil71
on
December 26, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
December 26, 2021
Rating:

No comments: