Technology

test

বড় হুজুর // ছোট গল্প- মু.বিল্লাল হোসেন


বড় হুজুর // ছোট গল্প
আছরের নামাজ শেষে ঈমাম সাহেব সকল মুসল্লীদের বসতে বললেন। ঈমাম সাহেবের নাম ক্বারী মাওলানা সুলাইমান। কিন্তু রহিমগঞ্জ এলাকায় সবাই ডাকে বড় হুজুর বলে। বয়স হবে আনুমানিক ৪৫ বছর। কিন্ত হুজুরের চেহারা মাসায়াল্লা ময়ূর ছাড়া কার্তিক। এই মসজিদে সে থাকে প্রায় ১৫ বছর যাবত। গ্রামের সবাই তাকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে। বয়ানের শুরুতে হামদ ও রাসূল (সঃ) এর উপর দুরদ পাঠ শেষে ডান হাত দিয়া দাড়ি খিলাল করতে করতে বলেন, এই গ্রামে শরিয়ত বিরোধী কাজ হইবো আর আপনারা বইসা বইসা দেইখা যাবেন। এর প্রতি উত্তরে কিছু বলবেন না? জব্বার মিয়া জিগাইলো ক্যান কি অইছে হুজুর? হুজুর বলে গ্রামের খোজ খবর রাহেন মিয়া ঐ কান্দি সবুর মিয়ার বাড়ি গান হইবো, বয়াতি আইবো।

হুজুর বলে সবাই মন দিয়া হোনেন মিয়া যা দ্যাখতেছি কেয়ামত আর বেশি বাকি নাই। কেননা আল্লাহর নবী ফরমাইয়াশেনঃ কিয়ামাতের পূর্বে আমার উম্মত গান বাজনা তথা বাদ্য যন্ত্রকে হালাল মনে করবে। আর হেই কাম করবো সবুর তালুকদার। এই কাজ যেমনে হোক ফিরাইতে হইবো। কি বলেন আপনারা ভাইসব? উপস্থিত সকলে বলে জ্বি বড় হুজুর ঠিক কইছে। হুজুর ফের বলে এ কাম ফেরানোর দায়িত্ব আমার একা না, আমি কুরআন হাদীসের বিধান জানি বলি আপনাগো বলতাছি। আল্লাহ কোরআনে ইরশাদ করছেনঃ তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য, তোমরা মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দিবা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবা।( আল ইমরান-১০৪) আল্লাহর নবী ফরমাইয়াশেনঃ তোমাদের কেউ যদি খারাপ কাজ দেখে, সে যেন তার হাত তা দিয়ে ফিরায়। তাতে যদি সে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন সে মুখ দিয়ে ফিরায়। তাতে যদি সে সক্ষম না হয়, তাহলে সে যেন মনে দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটা ইমানের সর্বনিম্ন স্থর।

এখন কি করবেন আপনারা ভাবেন। আমার দায়িত্ব আমি পালন করলাম। সমিরউদ্দীন গর্জে উঠে বলে, কি করমু মানি এ কাজ যেমনেই হোক ফিরামু। তিনি আরো বলেন আল্লাহর নবী বদর, উহুদ যুদ্ধ করছে, নিজের দান্দান মোবারক শহীদ করছে। তায়েফের ময়দানে কাফেররা তাকে নির্যাতিত করে রক্তাক্ত করছে। আর আমরা এ কাজ ফিরাইতে পারমুনা ইসলামের লাইগা। মুসল্লীগন বললো ঠিক আছে এহনেই সবাই যামু। লাল মিয়া ঢালি কয় সবুর মিয়ার সাহস দেইখা বাঁচিনা। বড় হুজুর যেই এলাকায় আছে, হেই এলাকায় আবার গান বাজনা? বড় হুজুরের নেতৃত্ব এলাকার সকল মুসল্লী সবুর মিয়ার বাড়ি উপস্থিত।

সবাই সবুরের বাড়ি উপস্থিত, এ যেন শিকার ধরতে এসে শিকারী হাতের নাগলের মধ্যে এরকম অবস্থা বিরাজমান সবার মাঝে। এলাকার মুরব্বি হাকিম ঘরামি বলে ওসবুর মিয়া বাইতে আছো? সবুর ঘর থেকে বের হয়ে বললো সালামালাইকুম, এত লোক আমার বাড়ি কিহের লাইগা? সবুর বলে চেয়য়ার দেয় বসেন সবাই। হাকিম সাহেব কয় চেয়ারের কাম নাই, হোনলাম তুমি নাকি উরশ করবা আবার বয়াতি ঠিক করছো ভান্ডারি গান করবা? হ কাকা নিয়্যাত তো করছি, পীর সাহেবকে ওয়াদা দিয়া আইছি প্রত্যকে বছর ফাল্গুন মাসের প্রথন সোমবার উরশ করমু। হাকিম সাহেব বাতলাইলেন হোনো মিয়া তুমি কোন জাগার মুরিদ অইছো, কি করো হেইডা আমাগো জানোনের দরকার নাই এই গ্রামে ঐসব চলবেনা। আজকে আসলাম বইলা গেলাম দ্বিতীয় দিন যেন কিছু বলা না লাগে। সবুর মনে মনে বলে পরের জমি খাইতেছে জোর কইরা, আর আমার বাড়ির গান ফিরাইতে আইছে। কি ভাবতেছো মিয়া, যে কথা কইলাম মনে যেন থাকে? দ্বিতীয়বার যেন আসা না লাগে। সবুর গলা নামিয়ে আস্তে উত্তর দেয় জ্বি বড় মিয়া মনে থাকবো।

সবাই যখন ফিরতেছে মনে হয় যেন লঙ্কা জয় করে আসছে, এমন একটা ভাব সবার মাঝে। ফিরতে ফিরতে মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। সবাই মাগরিবের নামাজ আদায় করে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলো, শুধু জব্বার মিয়া এবং হাবিব মৃধা মসজিদে রইলো। কারণ তারা দুজন হচ্ছে ধলপুর পীর সাহেবের মুরিদ, তারা নিয়মিত মাগরিবের নামাজ শেষ করে বিভিন্ন অযিফা পাঠ করে। তারা অনেক অযিফা পাঠ করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ আমি আমার ক্বলবের দিক মুতায়াজ্জু, আমার ক্বলব হযরত পীর সাহেব কেবলার দিকে মুতায়াজ্জু আছে, হযরত পীর সাহেব কেবলার উসিলায় আমার ক্বলবে আল্লাহর তাওয়াজ্জু এবং তার ফায়েয নসীব হয়।

এই মাসজিদে বিভিন্ন পীর সাহেবের মুরিদ আছে তবে ধলপুর এবং সোনামুখী দরবারের মুরিদ বেশি। ইমাম সাহেব সকলের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলেন। উভয়ের মুরীদানের সাপ্তাহিক জলাশয় তিনি উপস্থিত থাকেন। এক সময় তিনি মিলাদকে বিদায়াত বলতেন এবং মিলাদের অনুষ্ঠানে যেতেন না। কিন্তু এই এলাকায় ব্যাপক মিলাদের অনুষ্ঠান হয় এবং হাদিয়া তোওফা বেশি দেয়। এজন্য ইমাম সাহেব আগের মতো মিলাদ নিয়ে বেশি কথা বলেননা বরং বিভিন্ন মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত থাকেন।

মাঝে মাঝে আসপাশের ইমাম সাহেবগন সুলাইমান হুজুরের কাছে আসে গল্পগুজব করে চলে যায়। এইবার একজনে আগেকার কথা স্মরণ করানোর পর, তিনি বলেন ঐগুলো বুঝবেন না দেশ আন্দাজ চলাফেরা। বুঝেনতো অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা আল্লাহ বলছেনঃ তোমরা ডাকো আল্লাহর দিকে( হিকমতের) কৌশলের মাধ্যমে (আননাহল-১২৫) আল্লাহ আমাগো যে হেকমত শিখাইছে হেইডা পালন করমুনা? তারা ঐ আলোচনা শেষ করে পারিবারিক খোজ খবর নিয়ে বিদায় হলেন।

তিনি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও করেন। চিকিৎসা পেশার জন্য সবাই তাকে একটু বেশি কদর করে। গ্রামের সকল শ্রেণীর মানুষ তার কাছে আসে চিকিৎসার জন্য। সাধরণত মহিলাদের আনাগোনা একটু বেশি। প্রথম প্রথম তদবিরের জন্য তেমন হাদিয়া নিতেন না, শুধু মসজিদে কিছু দান কারা কথা বলে দিতেন। কিন্তু এখন হাদিয়া নেওয়া শুরু করছে। কেউ দেয় নগদ টাকা, কেউ দেয় দেশি হাঁস, মুরগী এবং বড় রোগ হতে মুক্তি পেলে কেউ কেউ খাসিও দেয়। হুজুরের চেহারা এবং শরীর স্বাস্থ্য অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমবার যখন এসেছিলো, তখন অনেক ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। আগেকার পাঞ্জাবি এখন তার গায়ে ঢুকে না। আগে পাঞ্জাবি পরতো সাধারণ কাপড়ের, এখন হুজুর পাঞ্জাবি পরে জাপানি টরে কাপড়ের এবং একটা সানগ্লাসও ব্যবহার করেন। এ যেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। সবেই সম্ভব হয়েছে চিকিৎসা পেশায় আসার কারণে।

পাশেই সিকদার বাড়ি মসজিদে একজন নতুন হুজুর আসছে। তিনি মিলাদ পরে না, নামাজ শেষে মোনাজাত দেয়না এবং তাবিজ কবজ ইসলামে জায়েজ নাই সে কথাও বলে। নতুন হুজুর তার মুসল্লীদের বিষয়গুলো কুরআন ও হাদীসের আলোকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। এবং তার আওতাধীন সকলকে তাবিজ নিতে নিষেধ করলেন। এভাবে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ নতুন হুজুরকে অনুসরণ করতে শুরু করলো। ঐদিকে বড় হুজুরের রোগি দিন দিন কমতে শুরু করলো, এটা তার কাছে মনে হলো মরার উপর খাঁড়ার ঘা। সে অনেক ফন্দি আঁটা সত্ত্বেও সফল হলো না।

কিন্তু একদিন সে জানতে পারলো যে, নতুন হুজুর মাজহাব মানে না। বড় হুজুর মনে মনে ভাবলো এইবার দেখাইতেছি তোমাকে আসল খেলা। তিনি এলাকার সকল মুসল্লীদের ডাকলেন এবং বললেন, হোনেন ভাই বাচ্চা না কাঁদলে মা কিন্তু দুধ দেয়না। আমরা যদি আল্লাহর কাছে কিছু না চাই , তাহলে আল্লাহ আমাগো কেমনে কিছু দিবে? আর চাইবেনতো মোনাজাতের মাধ্যমে হেইডা নাকি বিদায়াত কয় নতুন হুজুরে। মানলাম হেইডা জায়েজ নেই, কিন্তু নবীর শানে দুরুদ পরবেন হেইডা নাকি বিদায়াত। মানলাম এই দুইডা বিদায়াত, হোনালাম হে নাকি মাজহাব মানে না। পূর্ব পুরুষ থেকে আমারা ইমামে আযম আবু হানিফার অনুসরণ করতেছি এখন নাকি হেইডা মানা যাইবো না। বড় বড় বুযুর্গনাদ্বীন,আল্লাহর অলীগন মাজহাব মানছে। আর অনি কোন জায়গার হুজুর দুইদিন ধইরা কিতাব পইরা কয় ইসলামে কোন মাজহাব নাই। ব্যাস ব্ড় হুজুরের দায়িত্ব শেষ, এইবার যা করা লাগেবে করবো গ্রাম বাসি। সকল মুসল্লী খেপে গেলেন এবং সবাই লাঠিসোটা নিয়ে বের হলেন, আর স্লোগান তুললো লা মাজহাবিদের আস্তানা ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও, লামাজহাবিদের আস্তানা রহিমগঞ্জে থাকবেনা। হুজুরকে আজ মাজহাব না মানার প্রদিদান দিয়ে ছাড়বে এরা। যাইহোক এলাকার মেম্বার সাহেব এসে তাদের ফিরালেন এবং নতুন হুজুরকে বিদায় দিলেন।

এইবার বড় হুজুর একদেশে এক রাজা, তাকে আর রুখে কে? এলাকার যুবকদের নিয়ে বড় হুজুর হিলফুল ফুযুল সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলেন। যুবকরা সংগঠনে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কাজে সহযোগিতা করেন। এলাকায় যারা গরিব তাদেরও সহযোগিতা করেন । প্রত্যেক বছর তারা একটা মাহফিলের আয়োজন করে। এভাবে যুবকদের সংগটনের তহবিলে অনেক টাকা যমলো। সবাই ভাবলো টাকা কোথায় রাখা যায়? যুবকদের ভিতর একজন বললো, ব্যাংক একাউন্ট খুলে ব্যাংকে রাখি, বড় হুজুর উত্তর দিলো ব্যাংকে সুদ। ঐখানে টাকা রাখা যায়েজ নেই। অন্য একজন বললো তাহলে আমরা ইমাম সাহেবের কাছেই রাখি, হে তো সব সময় আছে। সবার সিদ্ধান্ত মোতাবেক হুজুরের কাছে সবাই টাকা জমা রাখলো।

যুবকদের ভিতর নয়ন ছিল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, সে মনে মনে ভাবলো একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করলে কেমন হয়! এই উদ্দেশ্য আরো কয়েকজনের সাথে সে আলাপ করলো সবাই একমত হলো। কিন্তু ঝামেলা বাজলো ইমাম সাহেবকে নিয়ে। সে মুসল্লীদের মাগরিবের নামাজ শেষে বললো আপনারা হোনছেন নি নয়ন নাকি লাইব্রেরি দিবো?? লাইব্রেরিতে হিন্দু, খ্রিস্টান এবং ইহুদি বেদুইনদের লেখকদের বই থাকবো। হেয়া পইড়া পোলাপান যাইবো নষ্ট হইয়া, ঈমান থাকবো না। হেয়ার কাম নাই আপনারা কি বলেন?? মুসল্লীরা সবাই বললো হুজুরে ঠিকেই কইছে লাইবারি করোনের কাম কি। তার থেকে কয়েকজেল কুরআন শরীফ কিইননা দিলে সওয়াব হইবো।

হুজুর বলে হাফেজি মাদ্রাসার ছাত্ররা এই এলাকায় খতম পড়তে আসলে অন্য মসজিদ থেকে কুরআন শরিফ আনোন লাগে। তাই নতুন কয়েকজেল কুরআন শরিফ কেনা হউক আপনারা কি বলেন? নয়ন কথার মাঝে বলে উঠলো, না আমি বলছিলাম কি, এর মধ্যে হাকিম সাহেব গর্জে উঠে বললো আজকালকার পোলাপান বেয়াদব হইয়া গেছে না হইলে মুখে মুখে কথা কয়? নয়ন গলা নামিয়ে আস্তে আস্ত বললো তাহলে অর্থসহ কুরআন আনলে কেমন হয়? হুজুর বলে না তার দরকার নাই ঐ কুরআন দিয়া খতম পরা যায় না। তাছাড়া আমলোকদের কুরআনের অর্থ জানোনের কাম কি? মাসয়ালা বলার দরকার হইলে হুজুররাতে আছেই।
ভেস্তে গেলো নয়নের স্বপ্ন, সাথে কিছু কড়া কথা শুনতে হলো।

এভাবে রহিমগঞ্জ বাসি শান্তিতে বসবাস করতো লাগলো। হঠাৎ একদিন কুদ্দুস ঘরামির বড় ছেলে বিকাল বেলা কান্না করতে করতে হাকিম মিয়ার কাছে বলতে লাগলো, তার বউকে সকাল থেকে খুজে পাচ্ছে না। ভেবেছিলো বাপের বাড়ি গিয়েছে বুজি, কিন্তু ফোন করে জানত পারলো ঐ বাড়িতে যায় নি। এর মধ্যে কে যেন খবর নিয়ে আসলো বড় হুজুরের ফোন বন্ধ, সকাল বেলা শহরে গিয়েছিল জরুরি কাজে আর ফেরেনি।

মু. বিল্লাল হোসেন
মাদারীপুর সরকারি কলেজ

বড় হুজুর // ছোট গল্প- মু.বিল্লাল হোসেন বড় হুজুর // ছোট গল্প- মু.বিল্লাল হোসেন Reviewed by pencil71 on October 11, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.