( তৃতীয় পর্ব.... চলবে )
আইয়ূব খানের শাসনামলের প্রথম দিকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেনি। ১৯৬৫ সালে তিনি নির্বাচন দেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার বিরোধি প্রার্থী ছিলেন মুসলীম লীগ মনোনিত মুহাম্মাদ আলীর বোন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। ১৯৬৬ সালে লাহোর প্রস্তাব কে ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু ৬দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করেন। যে আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ৬ দফাকে বাঙালিরা মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহন করেন। এ আন্দোলন কে স্তিমিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কে প্রধান আসামি করে আইয়ূব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে,এবং শেখ মুজিব কে গ্রেফতার করেন। কিন্তু পূর্বপাকিস্তানের গণ আন্দোলনের ফলে আইয়ূব সরকার মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়।
এরপর সারা পাকিস্তানে আইয়ূব বিরোধি ব্যাপক আন্দোলন হয়,যার ফলে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন কে বলা হয় গণঅভ্যুত্থান,কেননা সারা দেশের জনগণ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন জেনারেলের ইয়াহিয়া খানের হাতে।এ ক্ষমতা হস্তান্তর ছিলো যেন শিয়ালের কাছে মুরগি পালন করতে দেয়া। আইয়ূব খান ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ সকাল বেলা রেডিওতে ইয়াহিয়া খানকে সেনা প্রধান হিসেব ঘোষনা করে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ইয়াহিয়া খান বিকাল বেলা নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং আইয়ূব খানের সংবিধান বিলুপ্ত ঘোষনা করেন। ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দিবেন,সংবিধান দিবেন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন এই প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনিও নির্বাচন নিয়ে টালমাটাল শুরু করেন।
অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের ঘোষনা দেন।তিনি ভেবেছিলেন আওয়ামীলীগ পাকিস্তান তো দূরের কথা পূর্ব পাকিস্তানেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারবে না। বরং পূর্বপাকিস্তানে মুসলীম লীগ এবং ইসলামি দলগুলো কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পারবে। কিন্তু ফল হলো পুরোই উল্টো।১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক এবং পাকিস্তান কেন্দ্রীয় উভয় পরিষদে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে পি.পি.পি(পাকিস্তান পিপলস পার্টি) সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেন।নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সাড়া দেশের আশার প্রদিপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন।ভূট্টো এবং ইয়াহিয়া খান সাহেব নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তারা চাক্রান্ত করেন, যে কোন মূল্যে বাঙ্গালি তথা বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা ছাড়া যাবে না।ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশে হামলার ছক একেঁ, সময় ক্ষেপনের উদ্দেশ্যে গোলটেবিল আলোচনার ডাক দেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষাদিক জনতার সামনে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহনের নির্দেশ দেন। ইয়াহিয়া খান আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। কিন্তু কোনো সমাধান না করে পাকিস্তানে চলে যান।তিনি জেনারেল টিক্কা খানকে ইস্টার্ন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন এবং ইয়াকুব আলীর পরিবর্তে টিক্কা খান কে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে প্রেরণ করেন। টিক্কা খান সাহেব ২৫ শে মার্চ মাঝ রাতে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনার মাধ্যমে নিরহী বাঙ্গালিদের হত্যা শুরু করেন। পাক হানাদার বাহিনী সাড়া রাত রাজধানীতে হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা ঘুমন্ত ছাত্র,জনতা,নারী এবং শিশুদের হত্যা করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সচেতন এবং ঢাবির ছাত্রদেরকে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। নিরস্ত্র বাঙালির উপর হামলা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে পূর্ব পাকিস্তানের সেনা সদস্য পুলিশ এবং ইপিআর বাহিনি।কিন্তু পাক হানাদারদের অস্ত্র,গোলাবারুদ,ট্যাংকের সামনে তারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষনা করার অল্পসময় পরেই গ্রেফতার হন। ২৭শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম কালুর ঘাট রেডিও বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তির লড়াই। এই লড়াইয়ে যোগ দেন,ছাত্র,শিক্ষক,জনতা,শ্রমিক,সেনা সদস্য,পুলিশ বাহিনী এবং ইপিআর সদস্যরা।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন অগ্রগতি ছিলোনা। অগোছালো ভাবে মুক্তিকামী জনতা লড়াই চালিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করার লক্ষ্যে এবং সঠিক ভাবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাণনে ( বর্তমান নাম মুজিব নগর) গঠন করা হয় অস্থায়ী সরকার। এ সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধান মন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ।এ সরকারের রাজধানী ছিল মুজিব নগর।
মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন কর্নেল(অবসরপ্রাপ্ত) এম.এ.জি. ওসমানী।মুক্তিযুদ্ধের সময় সাড়া বাংলাদেশেকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিলো। এবং ইবিআর(ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে) এবং ইপিআরের(ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস,স্বাধীনতার পরে নাম হয়েছিলো বিডিআর) নিয়মিত সৈনিকদের নিয়ে তিনটি ফোর্স গঠন করা হয়েছিলো।
এইচ এম বিল্লাল
বিএ অনার্স (শেষ বর্ষ)
ইংরেজি বিভাগ
মাদারীপুর সরকারি কলেজ, মাদারীপুর
বৃটিশ থেকে বাংলাদেশ // প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
Reviewed by pencil71
on
December 24, 2020
Rating:
Reviewed by pencil71
on
December 24, 2020
Rating:

No comments: