আওয়ামিলীগের জ্যোষ্ঠ এবং বর্ষীয়ান চার নেতাকে হত্যা করে ঘাতকরা দেশ ছেড়ে চলে যান। খালেদ মোশাররফ অবশেষে সেনা প্রধান হন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ৭ ই নভেম্বর পাল্টা সেনা অভ্যুথানের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফের ভাগ্যে কালো মেঘের ছায়া নেমে আসে। এই সেনা অভ্যুথানের নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল তাহের। তিনি ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার অবসর প্রাপ্ত সেনা অফিসার।
খালেদ মোশাররফ সেনা প্রধান হওয়ার পরদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যা বিচারের দাবিতে ঢাকায় মিছিল হয়। এই মিছিলের সামনে ছিলো খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাই। এই ঘটনার পর কর্ণেল তাহের সেনা বাহিনী সদস্যদের বুঝাতো সক্ষম হয়েছিলেন যে, খালেদ মোশাররফ আওয়ামীলীগ এবং ভারতের দালাল। আর তৎকালিন সেনাবাহিনীর মাঝে ব্যাপক ভারত বিরোধী মনোভাব ছিলো।
কর্ণেল তাহের তার দলের লোকজনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মধ্যে লিফলেট বিতরন করেন এই মর্মে যে, অফিসররা সৈনিকদের থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে, সৈনিকদের নির্যাতন করে এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাই সেনা বাহিনীতে কোন অফিসার দরকার নেই। সকলের সমতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য সৈনিকদের উত্তেজিত করা হয়।
জনগন এবং সেনাবাহীনির মাঝে ভারত বিরোধি প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়। যার ফলশ্রুতিতে ঢাকায় রাজপথে জনতা নেমেছিলো এই সেনা বিপ্লবকে সমার্থন জানানোর জন্য। সেনা সদস্যরা ব্যাপক হারে অফিসারদের মারতে শুরু করে। কোন সৈনিকই অফিসারের কমান্ড মানেননি বরং অফিসাররা জীবন বাঁচাতে ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিলেন। জনতা এবং সৈনিকরা স্লোগান দিয়েছিলো এই বলে "সিপাহি জনতা ভাই ভাই,অফিসারের কল্লা চাই"। এসময় অসংখ্য অফিসারকে হত্যা করা হয়েছিলো। এবংঅনেক সেনা অফিসাররা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেছিলো।
এ সময় জেনারেল জিয়া ছিলেন গৃহবন্দী। কর্নেল তাহের এবং জিয়া ছিলেন ব্যাচমেট এবং বন্ধু। খালেদ মোশাররফ তাকে গৃহ বন্দী করেছিলেন। কিন্তু জিয়ার বাসায় টেলিফোনে লাইন সংযোগ থাকার ফলে তিনি সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পেরেছিলেন। খালেদ মোশাররফের হত্যার পরে কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর আস্থা ভাজন হয়ে যায়। কর্ণেল তাহের বন্ধুত্ত্বের কারণে জিয়াকে মুক্ত করেন এবং সৈনিকদের সামনে নিয়ে আসেন।
এরপর জমে নতুন খেলা। জিয়াকে সৈনিকরা মানতে রাজি হয় কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। কর্নেল তাহের কৌশলে সৈনিকদের বিভিন্ন দাবি সম্বলিত লেটারে জিয়াকে স্বাক্ষর করান। জিয়া ছিলেন ধূর্ত প্রতিকের লোক। তিনি সৈনিকদের সকল দাবি মেনে নেন এবং কৌশলে সৈনিকদের ব্যারাকে নিয়ে আসেন। এরপর যখন সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়, জিয়া শুরু করেন নতুন খেলা। তিনি সৈনিকদের সকল চুক্তি বাতিল করেন। তার বিপদের বন্ধু, যিনি তাকে ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছেন সেই কর্ণেল তাহেরকে তিনি আটক করেন। শুধু আটকেই নয়, তাকে রাষ্ট্রদ্রোহি মামলায় ফাঁসি দেন। এটাই ছিলো বুঝি বন্ধুত্বের প্রতিদান?
রাজনৈতিক হালচালে হেরে যেতে হয়েছিলো অগধ কূটকৌশলী তাহেরকে। এরপর জিয়ার আমলে ১১বার ব্যার্থ সেনা অভূথান হয়েছিলো। আদৌ তা হয়েছিলো কিনা? তা নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে মনে করেন সেনা অভূথানের কথা বলে, জিয়া তার বিরোধি সেনা অফিসারদের হত্যা করেছিলেন। জিয়ার শাসনামলে অনেক সেনা অফিসারকে ষড়যন্ত্রের বলি হতে হয়েছিলো। জিয়া নিরাপত্তার জন্য এরশাদ সাহেবকে জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
জিয়াউর রহমানের ভাগ্য অনেক ভালো ছিলো। কেননা তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, মৃত্যুর দুয়ার হতে। প্রথমে তিনি হন প্রধান সেনা প্রশাসক, পরবর্তীতে সেনা প্রধান। প্রধান বিচারপতি আবু সায়েমকে নামে মাত্র রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে তিনি দেশ পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হন।
তিনি বহুদলীয় গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে রাজনীতিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করেন। বাকশাল কায়েমের সময় সকল নিষিদ্ধকৃত রাজনৈতিক দলকে অনুমতি দেন। তিনি আব্দুস ছত্তারকে আহ্বায়ক করে জাগপা ( জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি) গঠন করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে ১লা সেপ্টেম্বর রমনা রেস্তোরায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বিএনপি ( বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) গঠন করেন। পরাবর্তীতে আব্দুসত্তারের জাগপার সকল নেতা কর্মী বিএনপিতে যোগ দেয়।
তিনি এসময় স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনীতির অনুমতি দেন। অনেক স্বাধীনতা বিরোধীদের তার দলে যোগ দেয়ার সুযোগ করে দেন। এ নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা দুটিই রয়েছে। কেউ মনে করেন তিনি সকলকে দেশের কাজে অংশগ্রহণ করানোর জন্য এ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কেউবা সমালোচনা করেছেন। ১৯৭৯ সালে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৮ টি আসনের ভিতর ২০৭ টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে।
তিনি সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতার পরিবর্তে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাস যুক্ত সহ বেশ কিছু পরিবর্তন আনয়ন করেন। এবং ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির নতুন ধারা শুরু হয়। ইসলামি দলগুলো রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। জিয়াউর রহমান এভাবে রাজনীতিতে নতুন ধারা শুরু করেন।
(চলবে....)
বৃটিশ থেকে বাংলাদেশ প্রত্যশা ও প্রাপ্তি // পর্ব- ৬
Reviewed by pencil71
on
September 25, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
September 25, 2021
Rating:

চলবে
ReplyDeleteExcellent
ReplyDelete