প্রতিটি মূহুর্তে আমাদের জীবনযুদ্ধের মাঝেই বেঁচে থাকতে হয়। আর ধর্মপ্রাণ ঈমানদারদের এই যুদ্ধ আরও কঠিন ও ভয়ংকর। এই ভয়ংকর রুপ নির্ভর করে ঈমানদার দাবীদাররা কতটা অসচেতন ও অসতর্ক তার উপর।
আমি কম জানা মানুষ, ভূরি ভূরি ডিগ্রীও নেই আবার ডিগ্রি কেনার অর্থও নেই কিন্তু তাই বলে দেশের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে, মুসলমানদের ইসলামি চেতনাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়াগুলো স্পষ্ট বুঝতে পেরেও কীভাবে চুপ থাকতে পারি? তাই আমি সচেতন নাগরিক হিসেবে কিছু ম্যাসেজ সচেতন পাঠকদেরও মনে করিয়ে যেতে চাই।
আমরা কী কেউ এখনও অনুধাবন করতে পারছি যে এতো এতো যুদ্ধের মাঝেও আমরা শব্দ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছি, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছি যদিও শব্দ বা সাংস্কৃতিক শব্দের সাথে যুদ্ধ সংযোগ করাকে হাস্যকর মনে করবে। অথচ এই যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য যে রসদ, যে সচেতনতা তার নূণ্যতমও অনুভূতি বা প্রস্তুতি আমাদের মাঝে দেখা যায় না আবার থাকলেও তা বিচ্ছিন্নভাবে ও হেলাফেলার সাথেই আলোচনা করা হয়। এই যুদ্ধ কিন্তু শুরু হয়েছিলো ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সাম্রাজ্যর পতনের ঠিক পর পরেই, যেন মুসলমানরা তাদের নিজস্ব ইসলামি চেতনা ও চিন্তাভাবনা নিয়ে কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যান্য যুদ্ধের পাশাপাশি শব্দের যুদ্ধও কিন্তু চলছে সমান তালে। শব্দের মাধ্যমে বাংগালী মুসলমানদের ভাষাকে, এর মমার্থকে, এর ইসলামি চেতনাকে বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টা চলছে কখনও ব্যাকারণের নাম করে কখনও বিদেশী শব্দ দূর করণের নাম করে। তাদের উদ্যোগতো প্রায় সফলই হয়ে যেত যদি না বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাদের বাড়া ভাতে ছাই না দিতো, এই জন্য এখনও তাদের, কাজী নজরুলের উপর ভীষন ক্ষোভ।
আমাদের প্রিয় রোমান্টিক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলামের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলো বাংলা সাহিত্যে ইসলামি শব্দ ও পরিভাষা, তথা আরবি শব্দের ব্যবহার করতে দেখে। এই ক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় নজরুলও দিয়েছিলো মোক্ষম জবাব । তিনিও লিখেছিলেন, “ আমি কথায় কথায় ‘রক্ত’ কে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি… এই আরবি ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভরতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন। আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রুপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয় যায় তখন ওরিয়েন্টাল। কিন্তু ওইগুলোই মুসলিমরা পরলেই তারা হয়ে যান ‘মিঞা সাহেব’ মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুষ্কিল তবু এ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপের অন্ত নেই।”
এইসব দুষ্কৃতিকারীদের কথা হলো বাংলা ভাষা থাকবে। সেখানে সুখ-দুঃখ থাকবে, আকাশ-বাতাস, নদী, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না থাকবে, সবই থাকবে, সবই প্রকাশ হবে , তবে তা হবে দাদাদের দেবদেবি কিংবা বিশ্বের অন্য কোন ভাবাদর্শে, ভাবাবেগে। সেখানে থাকবে না কেবল ইসলাম শব্দ, ইসলামি ভাবাদর্শ, ইসলামি ভাবাবেগ, ইসলামি বোধ-বিশ্বাস। বাংলাদেশে এই প্রচেষ্টা বর্তমানে আরো কুৎসিতভাবে দৃশ্যমান।
এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য হলো, মুসলিমদের তাদের আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া। আর সে লক্ষ্যে এ পথে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হলো নিজেদের ধর্ম ও দর্শনের ব্যাপারে তাদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ রাখা। অর্থাৎ ইসলামী সাহিত্যের স্থলে ‘ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য’ গড়ে তোলা। এবং অনেকক্ষেত্রে তারা সফলও এখন পর্যন্ত।
বাঙালি মুসলমানের যে একটি ভিন্ন সংস্কৃতি আছে, আলাদা ভাবনা বা আবেগ আছে আছে এটা তারা ও তাদের মদতদাতারা কখনও মানতে রাজি ছিলেন না । ষাটের দশক থেকেই তারা নববর্ষের নামে শান্তি নিকেতনের ব্রাহ্মধর্মীয় কায়দায় বৈশাখী উৎসব চালু করেন । রমনার বটমূলে প্রভাতে রবীন্দ্রনাথের আবাহনী সঙ্গীত ও ব্রাহ্মধর্মের কায়দায় সূর্যপূজার ভঙ্গিতে এই বৈশাখী অনুষ্ঠান চালু হয় । এই উৎসবকে বলে তারা এখন বলে হাজার বছরের সংস্কৃতি অথচ এসব উৎসবের কোথায়ও বাংলা সনের প্রবর্তক শাহ ফতেহউল্লাহ সিরাজী,সম্রাট আকবরের নাম নেওয়া হয় না ।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের শিকড় ছেঁড়া এই সংস্কৃতির আমদানি ও আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় উনিশশো ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের মাধ্যমে । ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুন ।এই দুজনের নাম যদিও মুসলিম কিন্ত এরা এবং এদের শিষ্যরা বাঙালি সংস্কৃতি বলতে বুঝতেন উনিশ শতকের কলকাতা কেন্দ্রিক বাবুদের সংস্কৃতি এবং শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রচলিত ব্রাহ্মধর্মের অনুষ্ঠানাদি ।
ওয়াহিদুল হক তো প্রকাশ্যে সভা-অনুষ্ঠানাদিতে ধূতি পরতেন ও নমস্কার জানাতেন । শেষপর্যন্ত তিনি নিজেকে একজন নাস্তিক দাবি করেছেন এবং মুসলমানি রেওয়াজ অনুযায়ী নিজের লাশ দাফন করার অনুমতি দেন নি । এ হচ্ছে সংস্কৃতিক যুদ্ধের পরাজয়ের ফলাফল।
এরা এখন প্রমিত এর নামে চাচ্ছে ভাষার সংস্কার! শব্দের সংস্কার! ভাষা ও শব্দ সংস্কারের নামে এই জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, মন মনন ও বোধ বিশ্বাসকে লালন ও ধারণ করে যে ভাষা হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে, সে ভাষাকেই বড় কুশলী পরিকল্পনার মাধ্যমে ইসলামি বিরোধী চিন্তা চেতনায় সংস্কার করা ।
কখন বুঝতে পারবেন বা প্রমান পাবেন যে উপরোক্ত সংস্কৃতিক বা শব্দযুদ্ধ সংক্রান্ত কথাগুলি সত্য?
যখন দেখবেন পত্র-পত্রিকা, টিভি মিডিয়া, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াতে কোন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে ’মরহুম’ ব্যবহার না করে ‘প্রয়াত’ শব্দ ব্যবহার করে।
মরহুম শব্দটির মধ্যে মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণ কামনা, দুআ ও মমতার সাথে স্মরণ করার যে আবেগ-অনুভূতি বিদ্যমান, সেই একই আবেগ ’প্রয়াত’ শব্দটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং পাওয়া সম্ভবও না। প্রয়াত দ্বারা সোজা কথায় অতীত হয়ে গেছে যিনি। এই যে অতীত হয়ে গেছে যিনি, তার সাথে আমাদের বর্তমানের কোন সংযোগ নেই! তার স্মরণে আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই, নেই তার জন্য কল্যাণ কামনার কোন আবেগ কিংবা গরজও! আর মুসলিমদের জন্য সম্মানজনক শব্দ থাকার পরও এই শব্দটি বা এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার শব্দযুদ্ধেরই নামান্তর।
এরপর যখন ইলেকট্রোনিক মিডিয়াতে কোন মুসলিম মারা গেলে ’ইন্তেকাল’ শব্দটির স্থানে প্রয়াণ শব্দের ব্যবহার! মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী ইন্তেকালের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাওয়া বুঝায় এবং এটাও বুঝিয়ে দেয়া হয় যে, তিনি নিঃশেষ হয়ে যাননি, অন্যজায়গায়, অন্যজগতে চলে গেছেন মাত্র। কিন্তু প্রয়াণ শব্দটি ইসলামি দর্শনের সে চেতনাকে লালন ও ধারণ কোনটাই করে না। তাহলে মুসলমানদের জন্য এশব্দ ব্যবহার কেন শব্দযুদ্ধের অংশ মনে করা হবে না।
জানাজার নামাজের ক্ষেত্রেও এরা শব্দযুদ্ধের ব্যবহার ঘটিয়েছে। জানাজার নামাজকে তারা এখন উপস্থাপন করে ’শেষকৃত্যানুষ্ঠান’ নামে। আফসূস। জানাজার নামাজ বাঙ্গালী মুসলিমের জন্য যে একটা ইবাদত, মৃত ব্যক্তির প্রতি ধর্মীয় দায়িত্ব পালন, মৃতকে স্বরণ করে নিজের মৃত্যুর কথা স্বরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, নিজের কর্ম চিন্তাকে পরিমার্জন করার যে একটা দায়বদ্ধতা, সেটা শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মধ্যে নেই। সেটা তো একজনের জীবনের জন্য শেষ অনুষ্ঠানমাত্র। কেবলই একটা আনুষ্ঠানিকতা। এ জাতীয় অনেক শব্দ দ্বারা মুসলিম শব্দ ভাণ্ডারকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে আর আমাদের মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা হিণ্যমনতায়ভুগে তাদের গোলামি করে যাচ্ছে।
এটা বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলিমদেরকে পরবর্তী প্রজন্মসহ ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার একটা কর্মসূচি ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই যে ভাষা, সাহিত্য, শব্দ নিয়ে যুদ্ধ বা চক্রান্ত এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের অবুঝ শিক্ষিত ধার্মিক ব্যাক্তিরাও যেন বেখবর। বর্তমানে কিছু জনপ্রিয় ইসলামী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও ইসলামী লেখকদের এসব ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়াতো নেই বরং দেখা যাচ্ছে তারাও সংস্কৃতিক দ্বাসত্বের শিকল পড়তে স্বদিচ্ছুক। আমাদের পূর্ববতী মুসলিম মনিষীরা আমাদের জন্য উপযোগী যে শব্দ ভাণ্ডার রেখে গেছে তাতে আমরা যেনো তুষ্ট হতে পারছি না। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিমদের দুটো উৎসবও ইবাদততের দিন ‘ঈদ’ শব্দটিকে ইদে রুপান্তর করেছে, ঈমান শব্দটিকে করেছে ইমান এরকম আরো অনেক বিবর্তন ঘটিয়েছে শুধুমাত্র ব্যাকারণ সংস্কারের নাম করে, ভীন দেশি শব্দ দূর করার বাহানায় এবং বাংলার নামে মৃতুপ্রায় সংস্কৃত ভাষা আমদানি প্রক্রিয়া চলছে অথচ বাংলাদেশে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধেই হয়েছে আরবী, ফারসি, ইংরেজি শব্দের অবাদ প্রবেশ ও গ্রহণের মাধ্যমে। যেসব ইসলামি নাম ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ও লেখক আছেন তাদের সচেতন ও সতর্ক হওয়া এখন অনেক জরুরী এবং সচেতন পাঠকদেরও উচিত বই পড়া, সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নজর রেখে, এদের সাহিত্য সম্ভার বাছ-বিচার করে পড়া এবং যেকোন অযাচিত সংস্কারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
রবিন খাঁন
তরুণ লেখক
শব্দযুদ্ধ
Reviewed by pencil71
on
April 17, 2021
Rating:
Reviewed by pencil71
on
April 17, 2021
Rating:

No comments: