( দ্বিতীয় পর্ব.... চলবে )
বৃটিশ শাসনামলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কোনো বিষয়ে ঐক্যমতে আসতে পারেনি, শুধু বৃটিশ খেদাও বা দেশ স্বাধীনতার বিষয় ছাড়া। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বেঙ্গল প্যাক্ট চুক্তির মাধ্যামে হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছিলো কিন্তু তার অাকস্মিক মৃত্যুতে সে সম্ভাবনা ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং মুসলমানদের খেলাফত আন্দোলনের
সময় হিন্দু মুসলিম কিছুটা কাছাকাছি এলেও, নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশিত হলে হিন্দু মুসলিম ঐক্য ভেস্তে যায়।এবং মোহাম্মদ আলীর দ্বি জাতি তত্ত্ব,শেরে বাংলার লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিম ঐক্য আশা সম্পূর্ণরুপে বিলোপ হয়।
ভারত স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে এসেও সে দ্বন্দ্ব দূর হয়নি।কারণ কংগ্রেস চেয়েছিলো অখন্ড ভারত এবং মুসলীম লীগ চেয়েছিলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র।এই রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে বৃটিশরা উপলব্ধি করেছিলেন ভারত একটি রাষ্ট্র হলে সংঘাত থামবে না,তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করে দিলেন।কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলো বাংলা আর পাঞ্জাব প্রদেশ নিয়ে।তাই যে অঞ্চলে হিন্দু বেশি তথা পূর্ব পাঞ্জাব এবং পশ্চিম বঙ্গকে দিল হিন্দুস্তান তথা ভারতকে, যেখানে মুসলিম বেশি তথা পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাঞ্জাবকে দিল পাকিস্তানকে। ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে, বিশেষ করে পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম ওলামাদের অনেক ভূমিকা ছিলো।তারা বক্তৃতার মাধ্যমে,লেখনীর মাধ্যমে,বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করেন।অবশেষে সব চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন করে যোগ হলো দুটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র দুটি আজও অব্দি বন্ধু প্রতিম হয়ে উঠতে পারেনি।
দেশ ভাগের পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম লীগ লিডার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কংগ্রেস লিডার শরৎচন্দ্রবসু অখন্ড বাংলার বিষয় একমত হয়েছিলেন।তারা একটি চুক্তি করেছিলেন বাংলা হবে আলাদা রাষ্ট্র, এ রাষ্ট্রে হিন্দু এবং মুসলিম মিলে শাসন কাজ পরিচালনা করবে।মুসলিম লীগের কিছু নেতার অমত সত্যেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শহীদ সাহেবকে এ কাজের অনুমতি দিয়েছিলেন।কিন্তু কংগ্রেস এ মত কে সমর্থন করেনি। কারণ তারা ভেবেছিলেন বাংলা প্রদেশে মুসলিম ৬০%,ভবিষ্যতে মুসলিমরাই এদেশের হর্তা কর্তা হবে।১৯০৫সালে বঙ্গভঙ্গ কে যে দাদা বাবুরা মেনে নিতে পারেনি তারাই কিন্তু ১৯৪৭ সালের বঙ্গ ভঙ্গকে মনে প্রানে মেনে নিয়েছিলেন,কিন্তু কেন?কারন সবই ছিলো রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার।যারা ১৯০৫ সালে বলেছিলেন বঙ্গভঙ্গ মানে বঙ্গ মাতার ভঙ্গ, তারা কিভাবে ৪৭ সালের ভঙ্গ বাংলা নিয়ে সন্তুষ্ট হলেন??
ভারত স্বাধীন হলো আমরা হয়ে গেলাম পাকিস্তানের অংশ।আমরা স্বাধীন হয়েও পরাধীন রয়ে গেলাম।বাংলার অনেক জায়গা মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠতা সত্ত্বেও আমাদের হারাতে হয়েছিলো,কিছু ক্ষমতা লোভী নেতাদের উদাসীনতার কারণে। আমরা এসে পড়লাম তারকাঁটা খাঁচা ছেড়ে লোহার খাচার ভিতর।আবার শুরু হলো নতুন ষড়যন্ত্র।যে শহীদ সাহেবের জন্য মুসলিম লীগ একমাত্র বাংলা প্রদেশে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়েছিলো,যে শহীদ সাহেব মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য ভারত ভাগ হওয়ার পরেও কলকাতা রয়ে গিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে বাংলার কিছু মুসলিম লীগ নেতারা ষড়যন্ত্র শুরু করলো।পাঞ্জাব প্রদেশ ভাগ হলো সেখানে মুসলিম লীগের নতুন কাউন্সিলের দরকার পরলো না,কাউন্সিলের প্রয়োজন হলো বাংলা প্রদেশে??
এভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শহীদ সাহেবকে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের পদে থেকে সরানো হলো।খাজা সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হলেন।
এরপর রাষ্ট্র ভাষা বাংলার প্রশ্নে বিরোধিতা শুরু করলেন এক শ্রেণীর বাঙালি মুসলিম লীগ লিডাররা।তারা ক্ষমতার মোহে,রাজনেতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সেদিন রাষ্ট্র ভাষা বাংলার বিরোধিতা করেছিলেন।পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করেন।পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও নেই এমন ঘটনা।পাকিস্তানিরা বুঝাতে চেয়েছিলেন বাংলা হিন্দুদের ভাষা,তাই এ ভষা মুসলিমদের পরিত্যাগ করা উচিত।একদল ধর্মান্ধ তাদের কথার সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার বিরোধিতা শুরু করে।এরপর ১৯৫৪ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও কে এস পি( কৃষক শ্রমিক পার্টি) যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয় লাভ করে,শেখ মুজিব সহ আওয়ামী মুসলিম লীগের তরুণ নেতারা মন্ত্রী হয়ে হয়েছিলেন। কিন্তু এই মন্ত্রী সভা বেশি দিন টিকেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কারণে। পাকিস্তান সংবিধান তৈরীতে সময় নিয়েছিলেন নয় বছর।সংবিধানে পাকিস্তানকে না ইসলামি প্রজাতন্ত্র,না অাধুনিক গণতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছিলো।
এরপর ১৯৫৮ সালের ৭ ই অক্টোবর প্রথমে ইস্কান্দার মির্জা এবং বিশ দিনের মাথায় আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে।গণতন্ত্র কে গলা টিপে হত্যা করে আইয়ুব খান দশ বছর মৌলিক গনতন্ত্রের নামে অবৈধভাবে দেশ পরিচালনা করে।
এইচ এম বিল্লাল
বিএ অনার্স (শেষ বর্ষ)
ইংরেজি বিভাগ
মাদারীপুর সরকারি কলেজ, মাদারীপুর
বৃটিশ থেকে বাংলাদেশ // প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
Reviewed by pencil71
on
December 18, 2020
Rating:
Reviewed by pencil71
on
December 18, 2020
Rating:

No comments: