পর্ব-০২
মালদ্বীপ ইমিগ্রেশন ও আমার অভিজ্ঞতা:
আমার গন্তব্য স্থান মালদ্বীপ। আরও একটি নতুন দেশ ভ্রমনের স্মরনীয় বিরল অভিজ্ঞতা যুক্ত হবে ছোট জীবনে। ভারত মহাসাগরের অযুত তরঙ্গশীর্ষে প্রতিফলিত রৌদ্রচ্ছাটা। যেনো রাশি রাশি বিছিয়ে রাখা চমকানো হীরে মুক্তা মনির সমাহার। নানা রঙের নীল আর সবুজ জলে ঘেরা মালদ্বীপের ক্ষুদ্রকায় দ্বীপপুঞ্জ। মহাসাগরের কন্ঠে হীরে,মানিক,নীলা,পান্না,মুক্তার মণিহার।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে দাওয়াত পেলাম মালয়েশিয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ইসলামিক স্কলারদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সিদ্ধান্ত নিলাম মালয়েশিয়া যাবো ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ। খুব ব্যস্ততার মাঝেও মালয়েশিয়ার ভিসার জন্য আবেদন করলাম। সহধর্মীনির সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম মালয়েশিয়া থেকে মালদ্বীপ হয়ে ফিলিপিন্সে ফিরবো। আলহামদুলিল্লাহ যথা সময় ভিসা হাতে পেলাম এবং মালয়েশিয়ার সম্মেলন শেষ করে ৩ জানুয়ারী ২০১৮ নতুন বছরের প্রথম বিদেশ ভ্রমন মালদ্বীপ দিয়ে শুরু করলাম।
মালদ্বীপের বিমান বন্দরটি একটি পুরো দ্বীপজুড়ে। অবতরনের সময় মনে হয় যেন একটি বিমানবাহী জাহাজের ডেকে নামছি। নামতে গিয়ে ভয় জাগে। পাইলট যদি লক্ষ্যভ্রস্ট হয়ে অবতরন করে সাগরে। রানওয়েটি দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে গিয়ে থেমেছে অন্য প্রান্তে।
মালেতে উড়োজাহাজে নামতে গিয়ে দেখা যায় সাগরের এত রং। ফিকে নীল,গাড় নীল, সবুজ,ঘোলাটে,পেস্ট ,সব রং মিলে গিয়ে রংধনুর অনেক রং। জল বর্নহীন। সাগর বর্নময়।আমাদের পাইলট দক্ষতার সাথে বিমান রানওয়ে অবতরন করালো।
১৯৬৮ সনে মালদ্বীপ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম ইব্রাহিম নাসির। তার নামেই বিমানবন্দরের নামকরণ হয়।ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর যা বর্তমানে ‘ভেনালা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ হিসেবে পরিচিত। বিমান বন্দরটি অবস্থিত ‘হুলহুলে’ দ্বীপে। পাশবর্তী দ্বীপের নাম ‘হুলহুমালে’। প্রয়োজনের তাগিদে পরবর্তী কালে কৃত্রিমভাবে সাগরের উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে হুলহুমালে দ্বীপটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাথে যুক্ত করা হয়।
মালদ্বীপের ভিসা পলিসি পৃথীবির সকল নাগরিকের জন্য ১মাস থাকা ফ্রী অর্থাৎ বিমান বন্দরে আগমনের পর এক মাসের ভিসা নিয়ে মালদ্বীপে প্রবেশের অনুমতি মিলে। মালয়েশিয়া থেকে মালদ্বীপ ৪:৩০মিনিট উড়ে বিমান ক্লান্ত হয়ে তার দরজা খুলে দিয়েছে হালকা হওয়ার জন্য। আমরা বিমানের পেট থেকে বাহির হয়ে তাকে এযাত্রায় মুক্তি দিলাম।ভিসার জন্য যথা নিয়মে লাইনে দাড়ালাম। লাইনের কিছুটা পিছনে থাকলেও দ্রুতই আমাদের ডাক পড়লো। সবুজ পাসর্পোট দেখেই অফিসার আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। তার চাহনী দেখে মনে হলো আমরা মালদ্বীপ এসে অপরাধ করে ফেলেছি। তিনি উর্ধতন অফিসারকে ডেকে আনলেন। শুরু হলো তাদের জিজ্ঞাসা যেনো আমরা বিসিএস এর ভাইবা বোর্ডে ফরেন ক্যাডারের জন্য ভাইবা দিচ্ছি। মালদ্বীপ কেনো আসছি,কোথায় থাকবো, হোটেল বুকিং আছে কিনা, কয় দিনের বুকিং আছে, কোথায় কোথায় যাবো, কয় দিন থাকবো, কতো ডলার সঙ্গে আছে,আমরা কি করি ?আরো নানা প্রশ্ন।এক পর্যায় আমি বললাম
আমার সহধর্মীনি আমেরিকার গ্রীনকাড হোল্ডার ও আমি ফিলিপিন্সের (9g) অর্থাৎ ব্যবসায়ী ভিসা হোল্ডার। আমরা তোমার দেশে আসছি সৌন্দর্য উপভোগের মাধ্যমে কিছু ডলার খরচ করতে যা দিয়ে তোমার দেশের উন্নয়ন হবে। অফিসার এবার মুচকি হেসে জানার আগ্রহ দেখালো সে আমিরিকায় কি করে, আমি ফিলিপিন্সে কি ব্যবসা করি ইত্যাদি। পাসপোর্টে সিল দিয়ে মালদ্বীপে স্বাগতম জানিয়ে অফিসার বিদায় নিলো।
শুরু হলো মালদ্বীপ ভ্রমন। বিমান বন্দরের গেট দিয়ে বাহির হয়েই চোখে পড়লো ভারত মহাসাগরের বিস্তৃর্ন জলরাশি। ট্যাক্সিগুলো পানির উপর ভাসছে যেনো সুনামির ফলে সমুদ্রের পানি বিমান বন্দরে উঠে আসছে।এ এক ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা।একটু খোঁজ নিয়ে জানলাম বন্দর থেকে রাজধানী মালে সহ অন্যান্য দ্বীপে যাওয়ার জন্য একমাত্র জলযানই ভরসা।আমি তথ্য কেন্দ্র থেকে হোটেলে ফোন করলে ম্যানেজার জানালো তাদের গাড়ী বন্দরেই আছে আমি যেনো একটু অপেক্ষা করি। কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের নাম লেখা প্লেকার্ড হাতে ড্রাইভার হাজির। তাদের নিজ দায়িত্বে লাগেজ গাড়িতে তুলে নিলো আমরা সিটে গিয়ে বসলাম। আমাদের গাড়ি চললো সমুদ্রের বুক চিড়ে তৈরি রাস্তা দিয়ে হুলহুমালে দ্বীপের হোটেল এলিটের উদ্দেশ্যে। হোটেলে পৌছে একটি ব্যাপারে অবাক না হয়ে পারলাম না তা হলো ম্যানেজার বাদে দারোয়ান থেকে শেপ অর্থাৎ সকল কর্মচারী বাংলাদেশী। তাদের সাথে আলাপ চারিতায় জানতে পারলাম প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশী কাজ করে মালদ্বীপের বিভিন্ন সেক্টরে যেখানে মালদ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ৪ লাখ।এদের অধিকাংশের আবার বৈধ কাগজের সমস্যা আছে। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না কেনো বিমান বন্দরে আমাদের এতো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। এক মাসের ফ্রি ভিসার সৎ ব্যবহার পৃথীবির অন্য দেশের জনগন না করলেও বাংলাদেশী জনগন করতে ভূল করেনি।
(চলবে)...
আগামী পর্বে থাকছে-“হুলোমালের সৌন্দর্য ও হুলো বিড়ালের গল্প”
আমার মালদ্বীপ ভ্রমন পর্ব-০২( মু.রেজাউল করিম)
Reviewed by pencil71
on
March 25, 2018
Rating:
Reviewed by pencil71
on
March 25, 2018
Rating:

No comments: